সাম্প্রতিকরোহিঙ্গা ইস্যু
অল সংবাদ ডেস্ক:
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিসহ দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে এ সমর্থন চাওয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে গতকাল সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠক হয়। বৈঠকে কূটনীতিকরা বাংলাদেশের অবস্থান সমর্থন করেন। এর আগে মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেও অত্যন্ত মানবিক কারণে কিছু লোককে আশ্রয় দিচ্ছে বাংলাদেশ। ‘পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, ওই সবলোককে ঢুকতে না দিয়ে পারা যায় না’- এমন মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তাদের খাবার, ওষুধপত্রসহ সব ধরনের মানবিক সহায়তা দিচ্ছে। সেখানে অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারে সৃষ্ট ওই সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে চাপ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলছে বাংলাদেশ। ওই সংবাদ সম্মেলনের পরপরই কূটনীতিকদের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করতে বৈঠকে বসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। সেখানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ভারত ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, মিশন প্রধান এবং ইউএনআরসি, আইওএম ও ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তারা অংশ নেন। সেখানে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বা কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। বৈঠক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে, মন্ত্রীর সঙ্গে কূটনীতিকদের বৈঠকে অত্যন্ত সরব ছিলেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ওয়ার্টকিন্স। তিনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের চলমান সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বলেন, ‘আমরা সেখানকার অবনতি পরিস্থিতি সম্পর্কে কমবেশী সবাই জানি। মিয়ানমারের বিষয় মিয়ানমারেই সমাধান হতে হবে।’ জাতিসংঘ দূত উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মানবতাকে সবার উর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানান। বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেন, মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের তীক্ষ্ণ নজর থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের তাগিদ দেন। রাখাইনে কেমন কয়েক দিন পরপর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে? সেই প্রশ্নও রাখেন আমেরিকান দূত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশন প্রধান রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়েদূন তাদের একটি প্রতিনিধি দলের রাখাইন রাজ্য সফরের বিষয়ে অবহিত করেন। একই সঙ্গে তিনি আক্রান্ত মানবতাকে সহযোগিতার প্রস্তাব করেন। রাখাইন থেকে প্রাণে বাঁচতে যারা সীমান্ত পাড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে তাদেরও মানবিক সহায়তার অঙ্গীকার করেন ইইউ দূত। সেখানে ইউরোপের অন্য প্রতিনিধিরাও মানবিক দিকটি বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তাদের নিজ নিজ দেশের তরফে সহায়তার অঙ্গীকার পূণর্ব্যক্ত করেন। বৈঠকের সমাপনীতে চীনের রাষ্ট্রদূত মা কিং কিয়াং ফ্লোর দেন। রোহিঙ্গারা এখন চীন সীমান্তের দিকেও যাচ্ছে বলে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত এ নিয়ে বাংলাদশ সীমান্তের অবস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানের বিষয়ে বেইজিংকে অবহিত করবেন বলে জানান। বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা রাতে মানবজমিনকে বলেন, আমেরিকা, ইউরোপ, চীনসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি বাংলাদেশের পক্ষেই কথা বলেছেন। ঘটনাটি মিয়ানমারের, এখানে বাংলাদেশ ভিকটিম- এটি সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন। মিয়ানমারের ঘনিষ্ট প্রতিবেশী এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসাসহ যে মানবিক সহায়তা দিচ্ছে তার প্রশংসাও করেছেন তারা। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রাখাইন রাজ্যের ক্রম অবনতিশীল পরিস্থিতির লাগাম দ্রুত টেনে ধরবে এবং রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান করবে- এমনটা কূটনীতিকরাও প্রত্যাশা করেছেন বলে বৈঠকে অংশ নেয়া সরকারী কর্মকর্তারা মানবজমিনকে জানিয়েছেন।
এদিকে বৈঠকের বিষয়ে রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যের বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা চেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, মিয়ানমারের পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে এবং বাংলাদেশে যেসব মিয়ানমারের নাগরিক অস্থায়ীভাবে শেল্টার নিয়েছেন, তারা তাদের মাতৃভূমিতে কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই ফেরত যাবে। মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ওয়াটকিন্স মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের পরিস্থিতির ক্রম অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে (বৈঠকের পরপরই) অতিথি ভবনে সংক্ষিপ্ত এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রী উপস্থিত গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের বলেন, আমরা কূটনীতিকদের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করেছি। আমাদের অবস্থান জানিয়েছি। এ নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়াও আমরা জানতে চেয়েছি। মিয়ানমার বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিবেশী দেশ। আমরা সৎ এবং সুপ্রতিবেশী হয়ে থাকতে চাই। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্নমুখী যোগাযোগ এবং সৎপ্রতিবেশী সুলভ আচরণের আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশা করেন, মিয়ানমারের নাগরিকদের ওপর নির্যাতনের কারণে বাংলাদেশ সীমান্তে যে অস্থিতিশীলতা ও মানবিক সংকট চলছে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমাধান হবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান বের করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তারা সংলাপে সমর্থন দিয়েছেন। বাংলাদেশ এই সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আলোচনা চালিয়ে আসছে। দেশটির গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী আং সান সূচির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দুবার বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার বিশেষ দূত হিসেবে পররাষ্ট্র সচিবকে মিয়ানমার পাঠিয়েছেন। আমি নিজেও কথা বলেছি। সব মিলে আমরা আশা করি মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক তা আরো বিস্তৃত ও গভীর হবে। এবং এর মধ্য দিয়ে আমরা সুপ্রতিবেশী হিসেবে এগিয়ে যাবো।
বাংলাদেশের আহ্বান: মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ব্রিফিংয়ের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়- সম্ভাব্য সব দিক থেকে (নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবেলা থেকে শুরু করে সামাজিক মীমাংসায় সহযোগিতা এবং রাখাইন রাজ্যের জনগণের অর্থনৈতিক উন্নতি পর্যন্ত) মিয়ানমারের সরকারকে সহায়তার গভীর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি যথাযথ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। নিজ নিজ দেশের সরকারকে এ ইস্যুতে সংবেদনশীল করে তুলতে কূটনৈতিক সম্প্রদায়কে অনুরোধও জানানো হয়, যেন এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া যায়। মিয়ানমারের সঙ্গে, বিশেষ করে নবনির্বাচিত এনএলডি সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে ও তা বজায় রাখতে বাংলাদেশের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনৈতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করেন। কূটনীতিকদের তিনি বলেন, ৯ই অক্টোবর মিয়ানমারের সীমান্ত চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে বাংলাদেশ সরকার দেশটির সরকারকে স্বপ্রণোদিত হয়ে সহায়তা করে আসছে। দায়িত্বশীল একটি প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শুধু ওই হামলার নিন্দাই জানায়নি, সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তাও প্রদান করেছে। বাংলাদেশ সীমান্তে বিপুল পরিমাণ রাখাইন মুসলিমরা প্রবেশ করছেন। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রচেষ্টাও তাদের থামাতে পারছে না। এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগও জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের যেন সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য না হয় তার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ এরই মধ্যে মিয়ানমার সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে। বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে এবং বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা তাকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে বলে কূটনীতিকদের অবহিত করেন মন্ত্রী। আলোচনায় কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা স্বীকার করেছেন যে, আক্রান্ত মানুষদের সহায়তার প্রয়োজন। অনুরোধ করা হলে তারা সহায়তা দেয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অসামঞ্জস্যপূর্ণ পাল্টা পদক্ষেপের ফলে রাখাইন রাজ্যে পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক।
মিয়ানমারকে চাপ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাশে চায় বাংলাদেশ: রাখাইন রাজ্যের মুসলমান জনগোষ্ঠীর ওপর অব্যাহত নির্যাতন এবং একটি বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়ার বহু দিনের চেষ্টার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে বিদেশে থাকা বাংলাদেশ মিশনগুলোকে সংশ্লিষ্ট দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনের হেড কোয়ার্টারকে ব্রিফ করার বিশেষ নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকা মনে করে মিয়ানমারের ওই সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সম্মলিতভাবে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করা উচিত। মিয়ানমারের ওই সমস্যার সমাধান মিয়ানমারকেই খোঁজা উচিত বলে মনে করে বাংলাদেশ। এ নিয়ে শুধু দেশে দেশে ব্রিফিংই নয়, ঢাকায় থাকা বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ও আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনের প্রতিনিধিদের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। সন্ধ্যায় ওই কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ের আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন ছিল- রাখাইনদের সমস্যা সমাধানের জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে চাপ দিতে বাংলাদেশ বলছে কিনা? জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিষয়টি বলছি। এটা ক্রমশ প্রকাশ্য! এখনই এরচেয়ে বেশি কিছু বলা যাবে না। সেখানে অপর এক প্রশ্নের জবাবে মাহমুদ আলী জানান, বাংলাদেশে অবস্থানরত মিয়ানমারের অনিবন্ধিত নাগরিকদের শরণার্থী হিসেবে মর্যাদা দেয়ার পরিকল্পনা আপাতত সরকারের নেই। বিজিবির অব্যাহত চেষ্টার পরও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ অব্যাহত আছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানবিক কারণে কিছু রোহিঙ্গাকে ঢুকতে দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে দুর্গম কিছু এলাকা রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, খোলা সীমান্ত দিয়ে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। বুদাপেস্ট ওয়াটার সামিট উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর হাঙ্গেরি সফর নিয়ে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে মুখ্য আলোচ্য হয়ে ওঠে মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি। মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের কড়া নজরদারি রয়েছে। কিন্তু জঙ্গল, পাহাড়সহ এলাকাটি এত দুর্গম, তাদের (রোহিঙ্গা) আটকানো মুশকিল। তিনি ওই এলাকার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আপনি যদি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যান, সেখান থেকে মিয়ানমারের বর্ডার আউটপোস্ট দেখা যাবে। সেখানে তাদের আটকাবেন কিভাবে? আটকানো মুশকিল আছে। তারপরও স্থানীয় প্রশাসন রোহিঙ্গাদের অনুপবেশ ঠেকাতে চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত রাখাইন থেকে যেসব লোকজন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে, তাদের খাবার, ওষুধপত্রসহ সব ধরনের মানবিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। সেখানে অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকার এদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের গণনা করেছে। আগামী মাসের শেষদিকে এ শুমারির ফলাফল প্রকাশিত হবে। তবে আপাতত তাদের শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। উল্লেখ্য, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বুধবার মিয়ানমারের দূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে ঢাকার তরফে গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানানো হয়। সেখানে মিয়ানমারে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ সীমান্তে হাজার হাজার রোহিঙ্গার অবস্থান এবং হাজারও রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি উল্লেখ করে এ জনস্রোত থামাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেশটির প্রতি আহ্বান জানায় বাংলাদেশ। মিয়ানমার দূতকে তলবের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বুধবার বিকালে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, একটি দায়িত্বশীল বা মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে যা যা করার বাংলাদেশ তা করছে। তিনি বেশ জোর দিয়েই বলেন, এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের যা করা দরকার তা-ই করা হচ্ছে এবং করা হবে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিসহ দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে এ সমর্থন চাওয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে গতকাল সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠক হয়। বৈঠকে কূটনীতিকরা বাংলাদেশের অবস্থান সমর্থন করেন। এর আগে মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেও অত্যন্ত মানবিক কারণে কিছু লোককে আশ্রয় দিচ্ছে বাংলাদেশ। ‘পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, ওই সবলোককে ঢুকতে না দিয়ে পারা যায় না’- এমন মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তাদের খাবার, ওষুধপত্রসহ সব ধরনের মানবিক সহায়তা দিচ্ছে। সেখানে অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারে সৃষ্ট ওই সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে চাপ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলছে বাংলাদেশ। ওই সংবাদ সম্মেলনের পরপরই কূটনীতিকদের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করতে বৈঠকে বসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। সেখানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ভারত ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, মিশন প্রধান এবং ইউএনআরসি, আইওএম ও ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তারা অংশ নেন। সেখানে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বা কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। বৈঠক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে, মন্ত্রীর সঙ্গে কূটনীতিকদের বৈঠকে অত্যন্ত সরব ছিলেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ওয়ার্টকিন্স। তিনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের চলমান সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বলেন, ‘আমরা সেখানকার অবনতি পরিস্থিতি সম্পর্কে কমবেশী সবাই জানি। মিয়ানমারের বিষয় মিয়ানমারেই সমাধান হতে হবে।’ জাতিসংঘ দূত উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মানবতাকে সবার উর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানান। বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেন, মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের তীক্ষ্ণ নজর থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের তাগিদ দেন। রাখাইনে কেমন কয়েক দিন পরপর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে? সেই প্রশ্নও রাখেন আমেরিকান দূত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশন প্রধান রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়েদূন তাদের একটি প্রতিনিধি দলের রাখাইন রাজ্য সফরের বিষয়ে অবহিত করেন। একই সঙ্গে তিনি আক্রান্ত মানবতাকে সহযোগিতার প্রস্তাব করেন। রাখাইন থেকে প্রাণে বাঁচতে যারা সীমান্ত পাড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে তাদেরও মানবিক সহায়তার অঙ্গীকার করেন ইইউ দূত। সেখানে ইউরোপের অন্য প্রতিনিধিরাও মানবিক দিকটি বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তাদের নিজ নিজ দেশের তরফে সহায়তার অঙ্গীকার পূণর্ব্যক্ত করেন। বৈঠকের সমাপনীতে চীনের রাষ্ট্রদূত মা কিং কিয়াং ফ্লোর দেন। রোহিঙ্গারা এখন চীন সীমান্তের দিকেও যাচ্ছে বলে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত এ নিয়ে বাংলাদশ সীমান্তের অবস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানের বিষয়ে বেইজিংকে অবহিত করবেন বলে জানান। বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা রাতে মানবজমিনকে বলেন, আমেরিকা, ইউরোপ, চীনসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি বাংলাদেশের পক্ষেই কথা বলেছেন। ঘটনাটি মিয়ানমারের, এখানে বাংলাদেশ ভিকটিম- এটি সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন। মিয়ানমারের ঘনিষ্ট প্রতিবেশী এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসাসহ যে মানবিক সহায়তা দিচ্ছে তার প্রশংসাও করেছেন তারা। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রাখাইন রাজ্যের ক্রম অবনতিশীল পরিস্থিতির লাগাম দ্রুত টেনে ধরবে এবং রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান করবে- এমনটা কূটনীতিকরাও প্রত্যাশা করেছেন বলে বৈঠকে অংশ নেয়া সরকারী কর্মকর্তারা মানবজমিনকে জানিয়েছেন।
এদিকে বৈঠকের বিষয়ে রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যের বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা চেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, মিয়ানমারের পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে এবং বাংলাদেশে যেসব মিয়ানমারের নাগরিক অস্থায়ীভাবে শেল্টার নিয়েছেন, তারা তাদের মাতৃভূমিতে কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই ফেরত যাবে। মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ওয়াটকিন্স মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের পরিস্থিতির ক্রম অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে (বৈঠকের পরপরই) অতিথি ভবনে সংক্ষিপ্ত এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রী উপস্থিত গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের বলেন, আমরা কূটনীতিকদের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করেছি। আমাদের অবস্থান জানিয়েছি। এ নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়াও আমরা জানতে চেয়েছি। মিয়ানমার বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিবেশী দেশ। আমরা সৎ এবং সুপ্রতিবেশী হয়ে থাকতে চাই। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্নমুখী যোগাযোগ এবং সৎপ্রতিবেশী সুলভ আচরণের আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশা করেন, মিয়ানমারের নাগরিকদের ওপর নির্যাতনের কারণে বাংলাদেশ সীমান্তে যে অস্থিতিশীলতা ও মানবিক সংকট চলছে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমাধান হবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান বের করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তারা সংলাপে সমর্থন দিয়েছেন। বাংলাদেশ এই সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আলোচনা চালিয়ে আসছে। দেশটির গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী আং সান সূচির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দুবার বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার বিশেষ দূত হিসেবে পররাষ্ট্র সচিবকে মিয়ানমার পাঠিয়েছেন। আমি নিজেও কথা বলেছি। সব মিলে আমরা আশা করি মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক তা আরো বিস্তৃত ও গভীর হবে। এবং এর মধ্য দিয়ে আমরা সুপ্রতিবেশী হিসেবে এগিয়ে যাবো।
বাংলাদেশের আহ্বান: মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ব্রিফিংয়ের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়- সম্ভাব্য সব দিক থেকে (নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবেলা থেকে শুরু করে সামাজিক মীমাংসায় সহযোগিতা এবং রাখাইন রাজ্যের জনগণের অর্থনৈতিক উন্নতি পর্যন্ত) মিয়ানমারের সরকারকে সহায়তার গভীর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি যথাযথ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। নিজ নিজ দেশের সরকারকে এ ইস্যুতে সংবেদনশীল করে তুলতে কূটনৈতিক সম্প্রদায়কে অনুরোধও জানানো হয়, যেন এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া যায়। মিয়ানমারের সঙ্গে, বিশেষ করে নবনির্বাচিত এনএলডি সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে ও তা বজায় রাখতে বাংলাদেশের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনৈতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করেন। কূটনীতিকদের তিনি বলেন, ৯ই অক্টোবর মিয়ানমারের সীমান্ত চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে বাংলাদেশ সরকার দেশটির সরকারকে স্বপ্রণোদিত হয়ে সহায়তা করে আসছে। দায়িত্বশীল একটি প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শুধু ওই হামলার নিন্দাই জানায়নি, সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তাও প্রদান করেছে। বাংলাদেশ সীমান্তে বিপুল পরিমাণ রাখাইন মুসলিমরা প্রবেশ করছেন। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রচেষ্টাও তাদের থামাতে পারছে না। এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগও জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের যেন সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য না হয় তার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ এরই মধ্যে মিয়ানমার সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে। বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে এবং বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা তাকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে বলে কূটনীতিকদের অবহিত করেন মন্ত্রী। আলোচনায় কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা স্বীকার করেছেন যে, আক্রান্ত মানুষদের সহায়তার প্রয়োজন। অনুরোধ করা হলে তারা সহায়তা দেয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অসামঞ্জস্যপূর্ণ পাল্টা পদক্ষেপের ফলে রাখাইন রাজ্যে পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক।
মিয়ানমারকে চাপ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাশে চায় বাংলাদেশ: রাখাইন রাজ্যের মুসলমান জনগোষ্ঠীর ওপর অব্যাহত নির্যাতন এবং একটি বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়ার বহু দিনের চেষ্টার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে বিদেশে থাকা বাংলাদেশ মিশনগুলোকে সংশ্লিষ্ট দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনের হেড কোয়ার্টারকে ব্রিফ করার বিশেষ নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকা মনে করে মিয়ানমারের ওই সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সম্মলিতভাবে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করা উচিত। মিয়ানমারের ওই সমস্যার সমাধান মিয়ানমারকেই খোঁজা উচিত বলে মনে করে বাংলাদেশ। এ নিয়ে শুধু দেশে দেশে ব্রিফিংই নয়, ঢাকায় থাকা বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ও আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনের প্রতিনিধিদের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। সন্ধ্যায় ওই কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ের আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন ছিল- রাখাইনদের সমস্যা সমাধানের জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে চাপ দিতে বাংলাদেশ বলছে কিনা? জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিষয়টি বলছি। এটা ক্রমশ প্রকাশ্য! এখনই এরচেয়ে বেশি কিছু বলা যাবে না। সেখানে অপর এক প্রশ্নের জবাবে মাহমুদ আলী জানান, বাংলাদেশে অবস্থানরত মিয়ানমারের অনিবন্ধিত নাগরিকদের শরণার্থী হিসেবে মর্যাদা দেয়ার পরিকল্পনা আপাতত সরকারের নেই। বিজিবির অব্যাহত চেষ্টার পরও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ অব্যাহত আছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানবিক কারণে কিছু রোহিঙ্গাকে ঢুকতে দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে দুর্গম কিছু এলাকা রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, খোলা সীমান্ত দিয়ে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। বুদাপেস্ট ওয়াটার সামিট উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর হাঙ্গেরি সফর নিয়ে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে মুখ্য আলোচ্য হয়ে ওঠে মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি। মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের কড়া নজরদারি রয়েছে। কিন্তু জঙ্গল, পাহাড়সহ এলাকাটি এত দুর্গম, তাদের (রোহিঙ্গা) আটকানো মুশকিল। তিনি ওই এলাকার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আপনি যদি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যান, সেখান থেকে মিয়ানমারের বর্ডার আউটপোস্ট দেখা যাবে। সেখানে তাদের আটকাবেন কিভাবে? আটকানো মুশকিল আছে। তারপরও স্থানীয় প্রশাসন রোহিঙ্গাদের অনুপবেশ ঠেকাতে চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত রাখাইন থেকে যেসব লোকজন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে, তাদের খাবার, ওষুধপত্রসহ সব ধরনের মানবিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। সেখানে অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকার এদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের গণনা করেছে। আগামী মাসের শেষদিকে এ শুমারির ফলাফল প্রকাশিত হবে। তবে আপাতত তাদের শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। উল্লেখ্য, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বুধবার মিয়ানমারের দূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে ঢাকার তরফে গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানানো হয়। সেখানে মিয়ানমারে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ সীমান্তে হাজার হাজার রোহিঙ্গার অবস্থান এবং হাজারও রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি উল্লেখ করে এ জনস্রোত থামাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেশটির প্রতি আহ্বান জানায় বাংলাদেশ। মিয়ানমার দূতকে তলবের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বুধবার বিকালে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, একটি দায়িত্বশীল বা মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে যা যা করার বাংলাদেশ তা করছে। তিনি বেশ জোর দিয়েই বলেন, এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের যা করা দরকার তা-ই করা হচ্ছে এবং করা হবে।
মন্তব্যসমূহ