স্ত্রীর পরকীয়ার কারণেই খুন।
সারা-প্রান্তর নিউজ ডেস্ক:
মুরাদনগরে সাড়ে ৭ মাস পর প্রবাসী ময়নালের মরদেহ খাল থেকে উদ্ধার
কুমিল্লা ডিবি পুলিশের তৎপরতায় খুন হওয়ার সাড়ে ৭ মাস পর মুরাদনগর উপজেলার আন্দিকুট ইউনিয়নের জাড্ডা বিলের একটি একটি খাল থেকে সৌদী প্রবাসী ময়নাল হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। স্ত্রীর পরকীয়ার জেরে ভাড়াটে খুনিদের হাতে খুন হওয়া ময়নাল হোসেনের লাশ সাড়ে ৭ মাস পর আদালতের নির্দেশে মঙ্গলবার দুপুরঅনুমান ১টার দিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে। গত বছরের ১ নভেম্বর রাতে ওই প্রবাসীর স্ত্রী তাছলিমা আক্তারের ভাড়াটে খুনিরা ময়নাল হোসেনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর হাত-পা বেঁধে মরদেহ পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে বাড়ির অদূরে একটি খালের পানি অপসারণ করে তলদেশে প্রায় ৬ ফুট মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুরাদনগর উপজেলার আকুবপুর ইউনিয়নের নোয়াহাটি গ্রামের মৃত আব্দুল কাদিরের সৌদি প্রবাসী ছেলে ময়নাল হোসেনের সাথে প্রায় ১০ বছর আগে একই উপজেলার আন্দিকুট ইউনিয়নের জাড্ডা গ্রামের মেয়ে তাছলিমা বেগমের বিয়ে হয়। তাদের ২টি সন্তান রয়েছে। সৌদি যাওয়ার পর সকল অর্থ স্ত্রী তাছলিমার কাছে পাঠায় ময়নাল। এদিকে প্রবাসী স্বামীর অনুপস্থিতিতে তাছলিমা বেগম একই গ্রামের শরীফুল ইসলাম নামের এক যুবকের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। পরে ময়নাল হোসেনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রবাসীর মরদেহ উদ্ধারের সময় গ্রেফতারকৃত বদি ডাকাত ও বাবু মিয়া সেখানে উপস্থিত ছিল এবং তারা লাশ পুঁতে রাখার স্থান দেখিয়ে দেয়। এ দিকে দীর্ঘদিন পর খাল থেকে ওই প্রবাসীর লাশ উত্তোলন করা হবে এমন খবরে এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। মরদেহ উদ্ধারের সময় উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) আলী আশ্রাফ ভূঁইয়া, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজগর আলী, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ একেএম মনজুর আলম, নব গঠিত বাঙ্গরা বাজার থানার অফিসার ইনচার্জ মোয়াজ্জেম হোসেন ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির এসআই সহিদুল ইসলাম। মঙ্গলবার সকাল থেকে উদ্ধারস্থল ঘিরে উৎসুক নারী-পুরুষ ও বিভিন্ন শ্রেণির শত শত মানুষের ভীড় জমে। এসময় খুনিদের ফাঁসির দাবি জানিয়ে এলাকাবাসী সেøাগান দেয়। তখন ময়নালের মা-বোন ও স্বজনদের আহাজারিতে এলাকায় শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির এসআই সহিদুল ইসলাম জানান, গত ১২ জুন তারই নেতৃত্বে ডিবির একটি টিম কসবা থেকে প্রবাসী ময়নাল হোসেনের ঘাতক মুরাদনগর উপজেলার জাড্ডা গ্রামের সোনা মিয়ার ছেলে বদিউল আলম ওরফে বদি ডাকাত (৩৫) এবং সোনারামপুর গ্রামের চারু মিয়ার ছেলে বাবু মিয়াকে (২৫) গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাদের জিজ্ঞাসাবাদে তারা ময়নাল হোসেনকে খুন করে লাশ গুম করার বিষয়টি স্বীকার করে এবং স্থানটি সনাক্ত করে। এ বিষয়ে রোববার আদালতে আবেদন করলে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্্েরট মরদেহ উদ্ধার ও ময়নাতদন্ত করতে কুমেক ফরেনসিক বিভাগকে ৩ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেয়।
গ্রেফতারকৃতদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৩০ অক্টোবর ময়নাল হোসেন সৌদী আরব থেকে দেশে আসার পর শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে অবস্থান করে। সে তার স্ত্রী তাছলিমা আক্তারের নিকট বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থের হিসাব চায় এবং স্ত্রীর পরকীয়ার বিষয় নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ দেখা দেয়। এতে তার স্ত্রী ক্ষিপ্ত হয়ে স্বামীকে হত্যার জন্য পরকীয়া প্রেমিকের পরিকল্পনা মতে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ৬ জন সন্ত্রাসীর সাথে চুক্তি করে। পরিকল্পনা মোতাবেক গত বছরের ১ নভেম্বর রাতে ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করার পর স্ত্রীর ভাড়াটে খুনিরা কৌশলে ওই প্রবাসীকে তার শ্বশুর বাড়ির অদূরে খাল পাড়ের নির্জন স্থানে নিয়ে হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে লাশটি পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে খালের তলদেশে প্রায় ৬ ফুট মাটির গভীরে গুম করে রাখে। এ ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে প্রথমে তাছলিমা আক্তার তার স্বামী নিখোঁজ হয়েছে মর্মে গত ৭ নভেম্বর মুরাদনগর থানায় জিডি করে এবং একপর্যায়ে সে আত্মগোপনে চলে যায়।
পরে ময়নাল হোসেনের মা আমেনা বেগম বাদী হয়ে ১ ডিসেম্বর মুরাদনগর থানায় মামলা দায়ের করেন। গত ৩ জানুয়ারি কুমিল্লা পুলিশ সুপারের নিকট আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলাটি তদন্তের জন্য জেলা ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। চলতি বছরের ৮ মার্চ কুমিল্লা মহানগরের ফৌজদারী মোড় এলাকা থেকে মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির এসআই শাহ কামাল উদ্দিন আকন্দ পিপিএম ময়নাল হোসেনের স্ত্রী তাছলিমা আক্তারকে গ্রেফতার করে। পরে ডিবি’র জিজ্ঞাসাবাদে তাছলিমা আক্তার তার স্বামী ময়নাল হোসেনকে হত্যার কথা স্বীকার করে চাঞ্চল্যকর জবানবন্দী দেয়। পরদিন গ্রেফতার করা হয় তাছলিমা আক্তারের প্রেমিক শরিফুল ইসলামকে। গত ১০ মার্চ স্ত্রী তাছলিমা আক্তার স্বামী ময়নাল হোসেন হত্যাকা-ের সাথে জড়িতদের নাম প্রকাশ করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এতে ডিবি অপর আসামিদের গ্রেফতার করার জন্য অভিযানে মাঠে নামে। বর্তমানে ওই ২ ঘাতক ছাড়াও এ মামলায় কারাগারে আরো আটক রয়েছে প্রবাসীর স্ত্রী তাছলিমা আক্তার, তার নিকটাত্মীয় জাকির হোসেন, জুয়েল মিয়া ও পরকীয়া প্রেমিক শরিফুল ইসলাম।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ডিবি’র এসআই সহিদুল ইসলাম আরো জানান, কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো: শাহ আবিদ হোসেন ও ডিবির ওসি একেএম মঞ্জুর আলমের দিক নির্দেশনায় মামলাটির রহস্য উৎঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, ময়নাল হোসেনের মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে কুমেক হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। এদিকে মরদেহ উদ্ধারের সময় উপস্থিত লোকজন ডিবি পুলিশের প্রচেষ্টার কারণে এ মামলার রহস্য উৎঘাটনসহ মরদেহ উদ্ধার করতে পারায় ডিবির কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
স্থানীয়রা জানায়, ঘটনার শুরুতে মুরাদনগর থানা পুলিশ ঘটনাটি ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করায় এ রহস্য বের হয়নি। মরদেহ উদ্ধারের সময় নিহত প্রবাসী ময়নালের মা ও বোনসহ অন্যান্যরা ঘটনার সাথে জড়িত অপর আসামীদের গ্রেফতার ও বিচার দাবি করেন।
মন্তব্যসমূহ